একজন পাঠকের বই পড়ুয়া হয়ে ওঠার গল্প

আমার বই-পডুয়া হয়ে ওঠার গল্প।
বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটি হচ্ছে পাঠকের ভুল। বই লেখা জিনিসটা একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয়, কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়।
— প্রমথ চৌধুরী

সময়টা ২০০৩ সালের শেষের দিক। আমি তখন সিলেট পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালের ৩য় শ্রেনীর ছাত্র। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে, ফলাফলও যথেষ্ট ভাল। এখন ৪র্থ শ্রেনীতে ভর্তি হব। ভর্তি হতে হাতে আরো ১ মাস বাঁকি, খাই ঘুমাই একা একা আপন মনে হাঁটি। আমি সব সময় একা একা থাকতে ভালবাসি। সেই জন্য আমার জীবনে প্রিয় বন্ধুর তালিকা খুব নগন্য।
যাইহোক, আমার বাবা একজন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর, একদিন রাত ১২টায় ডিউটি হতে এসে আমাকে ডেকে বললেন, “দেখো তোমার জন্য কি এনেছি!” আমি ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি, একটা ভূতের গল্পের বই।
বইটির নাম “জোলা ও সাত ভূত” । তখন চোখে ছিল প্রচন্ড ঘুম, তাই মনে মনে বললাম, পরীক্ষার দিয়েও বই পড়া থেকে নিস্তার নেই হায়রে কপাল।

পরের দিন সকালে নাস্তা করে বইটা নিয়ে পড়তে বসলাম। বইটা পড়ছিলাম আর বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। এইভাবে যে কখন বইটা শেষ হল বুঝতেই পারি নাই। এই বইটির মাধ্যমে আমার বইয়ের অচেনা ভুবনে যাত্রা শুরু।
ঠিক সেই বছর সিলেট পুলিশ লাইন মাঠে বই মেলার আয়োজন করা হয়েছিলো। বাবার হাত ধরে সেই বছর প্রথম বই মেলাতে যাওয়া। গিয়ে কিনে ফেললাম মোল্লা নাসিরুদ্দীন এর জোক্স । বইটা ছিল বেশ মোটা, তাও পড়ে ফেললাম একদম একটানা। বই পড়ার প্রতি একধরণের ভাল লাগা কাজ শুরু করে দিল।

আমাদের পাশের ফ্লাটে থাকতো সোমা দিদি। উনারা তিন বোন, তিন বোনই সেই লেবেলের ছাত্রী। প্রতিবছর প্রথম হত আর প্রচুর বই উপহার পেত। আমি উনার বড় বোনের কাছে পড়তাম সেই সুবাদেই আপুদের বই গুলো পড়ারর সুযোগ হতো আমার। তখন পড়েছিলাম ঈসপের গল্প, গ্রীম ভাইদের রুপ কথা ইত্যাদি আরও অনেক বই। এই বই গুলো পড়ার পর আমার বই পড়ার প্রতি প্রচুর আগ্রহ তৈরি হল।
২০০৪ সালের আব্বু র‍্যাব- ২ তে পোস্টিং হয়ে সিলেট থেকে ঢাকাতে চলে যান। আমাদের হোম টাউন ছিল নরসিংদী। ঢাকা থেকে নরসিংদী যোগাযোগ সুবিধা থাকার কারনে আব্বু আমাদের উনার সাথে নরসিংদীতে শিফট করেন । সেখানে ছিলাম প্রায় ২বছর । পরে আববু আবার সিলেটে পোস্টিং হলেন। সিলেটে এসে ভর্তি হলাম ৭ম শ্রেনীতে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম তাই ৮ম শ্রেনীতে প্রথম হতে পেরেছিলাম।
যাইহোক আমাদের বাসার পাশে ছিল সিলেট কেন্দ্রীয় জাতীয় গ্রন্থগার, কি বই নেই এই গ্রন্থগারে, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় স্কুলের ব্যাগে সিভিল ড্রেস ভরে নিয়ে যেতাম। বাসা থেকে বের হয়ে স্কুল ড্রেস বদলে গ্রন্থগারে ডুকে পড়তাম। ( এক কথায় যাকে বলে স্কুল চুরি হা-হা-হা)

পড়ে শেষ করে ফেললাম শরৎ সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, আরব্য রজনীর কাহিনি, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য আরো প্রচুর বই।
এই বইগুলো আমাকে বই পড়ার প্রতি নেশা আরো বাড়িয়ে দিল। আমাকে আর পায় কে, একে তো ছিল বই পড়ার পুরোনো নেশা, নেশা আরো কড়া হল, আমি সেই লাইব্রেরিতে যাওয়া শুরু করলাম স্কুল মিস দিয়ে আমি লাইব্রেরিতে বই পড়া শুরু করলাম,সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পযন্ত আমি বই পড়ি পাঠাগারে।
ফলাফল ক্লাস এইটে ১ রোল থেকে নবম শ্রেনীতে রোল ১১ তে গিয়ে ঠেকল।
এর পর আমার মনে হল আমি যেই বই গুলো পড়েছি তা সংগ্রহ করতে হবে, যেই কথা সেই কাজ স্কুলের টিফিন খরচ ও রিক্সা খরচ বাচিয়ে বই কিনা শুরু করলাম।স্কুল পাশ করে কলেজে ওঠলাম। তখন প্রচুর ছাত্র পড়াতাম । মাস শেষে অনেক টাকা পেতাম প্রচুর বই কিনতাম প্রচুর বই পড়তাম। আমার প্রতিদিনের রুটিন ছিল -কলেজে যাওয়া, টিঊশানি করা, আর বই পড়া, তখন আমার কারো সাথে ১ মিনিট কথা বলার চেয়ে বই পড়াটা বেশী প্রেফার করতাম আব্বু আম্মু ভাবত…
আমাদের ছেলেটা বুঝি অসামাজিক হয়ে গেল।
বর্তমানে আমি আমি সিলেট লিডিং ইউনিভারসিটিতে পড়ি । আমার সংগ্রহিত বইয়ের সংখ্যা ২৫০০ প্রচুর বই পড়ি, প্রচুর বই কিনি এমন মাস বাদ পড়ে না যে আমি ১০টার নিচে বই কিনি।
সবশেষে, আপনাদের জানতে ইচ্ছে হবে যে আমি কার কাছ থেকে বই পড়তে বেশি অনুপ্রানিত হয়েছি? আমি বলব যে আমি আমার অনুপ্রেরনা আমি নিজে , আর আমার এক বন্ধু অদ্বিতিয়া আমাকে বই পড়তে বেশী অনুপ্রানিত করত।
আমি কোন গল্পকথক না যে, একটা গল্প খুব সুন্দর করে গুছিয়ে প্রেজেন্ট করব । তাও সত্যিটা বলেছি ,ভুল ক্রুটি হলে মাফ করে দিবেন। আমি সবসময় যা বলতে চাই তা বলতে পারি না। যাইহোক, পাঠক সমাজ আপনারা বুঝে নিবেন । বানানজনিত ভুল ভাষাগত কোন ভুল হলে ক্ষমা করে দিবেন প্লিজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *