ঢাকাসোমবার , ৪ মে ২০২০
  1. ইসলাম
  2. ছোট গল্প
  3. বই
  4. বিজ্ঞান-ও-প্রযুক্তি
  5. বিনোদন
  6. বিশ্বকোষ
  7. ব্যবসা
  8. ভিডিও
  9. ভ্রমণ
  10. মার্কেটিং
  11. মোটিভেশনাল স্পিচ
  12. স্বাস্থ্য বিষয়ক
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পিছিয়ে পড়ার গল্প | শাহনূর শাহীন

প্রতিবেদক
dipu
মে ৪, ২০২০ ৭:৫০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শাহনূর শাহীন

খুব ঝটপট তৈরি হয়ে নিলো অয়ন। জীবনে প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ দিবে আজ। ইন্টারভিউতে অংশ নিতে পারলে চাকরিটা মোটামুটি নিশ্চিত। মামা খালু বা অন্য কোনো উপায়ে কারো সুপারিশ টিকবে না ওখানে। অয়নের রিলেটেড এক পদস্ত কর্মকর্তা ওর জন্য সুপারিশ করে রেখেছে। যেন মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেয়া হয়। অন্যদিকে ওই পদের জন্য অয়ন ছিলো পারফেক্ট। একেবারে যোগ্য প্রার্থী।

অয়ন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স শেষ করেছে মাত্র। ছেলেটা খুবই মেধাবী। কিন্তু কিছুটা বেখেয়ালি টাইপের। সময়ের কাজ সময়ে করার অভ্যাস খুব কম। অনেকটা অলসের মতো। এর জন্য ওকে অনেক বেগ পোহাতে হয় সময়ে সময়ে। কিছুটা আড্ডা প্রিয়ও বলা যায়। সারাক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি। ফেসবুক। আর বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা গল্পে মেতে থাকতে পছন্দ করে। ঘুরাঘুরিও বেশ পছন্দ তার। মাঝে মাঝে ফেসবুক বন্ধুদের নিয়েও আড্ডা বসায়। আড্ডা আর অলসতার কারণে প্রতিদিনই বকাঝকার স্বীকার হয়। বকা শুনতে হয় বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব ও কাছের মানুষেদের কাছ থেকে।

একেবারেই যে পারমানেন্টলি অলস তা নয়। কোনো কাজ করলে আবার করার মতই করে। কেউ যদি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারে তবে সে সেরাটাই নিতে পারে তার থেকে। কিন্তু তারপরও ওই যে বেখেয়ালি আর অলসতার ট্যাগ লেগে গেছে তাতে অয়নের ভালো কাজগুলোও ভালো চোখে দেখে না অনেকে। কেউ কেউ তো ভালো কাজটাকে মন্দ দিয়ে পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করে। কাছের লোকেরা কখনোই তাকে বুঝার চেষ্টা করে না। কোনো কাজের ব্যার্থতার দায়ভার পুরোটাই ওই একটা দোষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিস্তার পেতে চায় সবাই। কখনোই কেউ আসল কারণ খুঁজে দেখার চিন্তাও করে না।

আজকেও তেমন কিছুরই মুখোমুখি হতে চলছে অয়ন। সকালে বের হওয়ার সময়েই তার এমনটা মনে হয়েছে। এর কারণও আছে। বাসা থেকে বের হয়ে রিক্সায় ওঠে। কিছুদূর যাওয়ার পর রিক্সার চাকা পাঞ্চার হয়ে যায়। বাকী পথ হেটেই যেতে হয় অয়নকে। তারপর বাসে ওঠার পালা। ঠিকঠাক উঠলো বাসে। কিন্তু কিছুক্ষণ চলার পর ভয়ঙ্কর আর্তচিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো বাস। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহুর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

অয়ণ অক্ষত আছে। কিন্তু চোখের সামনে রক্তাক্ত বিভৎস মানুষের চেহারা দেখে নিজেকে সামলাতে পারেনি। ভুলে গেছে তার ইন্টারভিউয়ের কথা। আহত মানুষের সাহায্যে নিজেকে নিযুক্ত করে দিলো। অয়নের এই একটা ভালো গুন মানুষের কাছে খুব প্রিয় করে তুলেছে তাকে। কারো বিপদ দেখলে সাধ্যমতো চেষ্টা করে সহযোগিতা করার। খুব মিশুকও ছেলেটা। দোষ একটাই নিজের ব্যাপারে বেখেয়ালি। কিন্তু আজকে অয়ন সময়মতোই বাসা থেকে বেরিয়েছিলো। কিন্তু এক্সিডেন্ট তাকে পিছিয়ে দেয়। ইন্টারভিউয়ের জন্য যতক্ষণে সে পৌঁছে ততক্ষণে ইন্টারভিউ শেষ। এমনকি অন্য একজন প্রার্থীকে সবুজ সংকেত দিয়ে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ।

চাকরিটা ছিলো সরকারি একটা দপ্তরে প্রকাশনা সম্পাদনার। অয়ন ছোটবেলা থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত ছিলো। কলেজের বার্ষিকীতে প্রকাশনা সম্পাদনার দায়িত্বটা প্রতি বছর তার কাঁধেই পড়তো। ছাত্র হিসেবেও মেধাবী ছিলো। এমনিতে পড়াশুনা করতো না ঠিক মতো। সারাক্ষণ ঘুরাঘুরি আর আড্ড। কিন্তু পরীক্ষায় বেশ ভালো রেজাল্ট করতো সব সময়। এতে অনেকে ঈর্ষা করতো। পড়ালেখা করে না ঠিকমতো অথচ রেজাল্ট ভালো। যে কোনো পরীক্ষার আগে সারা বছর পড়ালেখা করে না এই অভিযোগে বকাঝকা খাওয়া তার নিয়মিত রুটিন হয়ে গেছে। কিন্তু রেজাল্ট বেরুলে আবার সবার মুখেই হাসি ফুটতো। সবাই তখন প্রশংসা করতো বটে! তবে তাও কিছুটা খোঁচা মেরে।

পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় পাশের বাড়ির আঙ্কেল তার জন্য সুপারিশ করেছিলো চাকরিটার জন্য। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। শেষ পর্যন্ত অয়ন ইন্টারভিউয়ে সময় মতো উপস্থিত হতে না পারায় তিনিও কিছুটা অপমানিত হয়েছেন অফিসে। কিন্তু আজকেও কেউ তাকে বুঝার চেষ্টা করেনি। জানতে চায়নি কেউ পিছিয়ে পড়ার কারণ। পরিবারের কেউও না। সবাই তাকে ইচ্ছেমতো অপমান-অপদস্ত করলো। নিজেকে আজকে অযোগ্য, অপদার্থ, অপয়া মনে হচ্ছে অয়নের। বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।

দু’দিন ধরে ফোন অফ অয়নের। সবাই তাকে খুঁজছে। সরকারি দপ্তরের ওই আঙ্কেলও। চাকরিটা অয়নকেই দিতে চাচ্ছে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারাও। কারণ পরেরদিন পত্রিকার পাতায় অয়নের ছবি দেখে সবাই জানতে পারে অয়নের দেরির কারণ। সবাই দুঃখ করে ছেলেটাকে বকাঝকা করার কারণে।

দু’দিন, তিনদিন, এক সপ্তাহ। ফোন বন্ধ অয়নের। এভাবেই পিছিয়ে পড়ে অয়ন। রাগে ক্ষোভে নিজেকে আড়াল করে ফেলেছে সে। তার দুঃখ একটাই কাছের মানুষরা কখনোই তাকে বোঝার চেষ্টা করেনি। তাই এবার একা একাই নিজেকে এগিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে নেমেছে অয়ন। কাছের মানুষদের অবহেলা আর নিন্দা অনেক কাঁদিয়েছে অয়নকে। অনেক সময় একা একা নিরবে চোখের জ্বল ফেলে দুঃখ নিবারণ করতো। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিতো না। কেউ বুঝতেও পারতো না তাকে দেখে। চোখের আড়ালে পাহাড় পরিমাণ কষ্ট চেপে রাখলেও কেউ বুঝতে পারে না অয়নকে দেখে। কেননা সব সময় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা তার অভ্যাস।

অয়ন এবার নিজেকে বদলে নেয়ার সংগ্রামে নেমেছে। কাছের লোকেদের কাছে অবহেলিত হলেও দূরের লোকেরা অয়নকে খুব ভালোবাসে। এমন অনেকে আছে যাদের সাথে কোনোদিন দেখাও হয়নি তারাও অয়নকে খুব ভালোবাসে। আপন ভাবে অয়নকে। ফেসবুকে অনেকের সাথেই পরিচয় ঘটে যারা অয়নকে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে অনেকের সাথে দেখা সাক্ষাতও হয়। এক্সিডেন্টের ওই ঘটনার পর অনেকের কাছে সে মহত একজন প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু কাছের মানুষদের অবহেলা, ঈর্ষা, হিংসা আর দোষারোপের কারণে পিছিয়ে পড়া অয়ন এখন খুব একাকিত্বে ভোগে প্রতিনিয়ত। তবুও দূরের মানুষেদের ভালোবাসায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে ঘুরে দাঁড়ানোর। একই মুদ্রার ভিন্ন ভিন্ন রুপ। এক পাশে নিন্দিত অন্যপাশে নন্দিত। এই ভেবে কখনো নিরবে চোখের জ্বল ফেলে আবার কখনো আনন্দে হেসে ওঠে অয়ন। এভাবেই চলছে এখন অয়নের দিনকাল……………….

Facebook Comments