ঢাকাশনিবার , ৯ মে ২০২০
  1. ইসলাম
  2. ছোট গল্প
  3. বই
  4. বিজ্ঞান-ও-প্রযুক্তি
  5. বিনোদন
  6. বিশ্বকোষ
  7. ব্যবসা
  8. ভিডিও
  9. ভ্রমণ
  10. মার্কেটিং
  11. মোটিভেশনাল স্পিচ
  12. স্বাস্থ্য বিষয়ক
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাবরি মসজিদ ও তার ইতিহাস

প্রতিবেদক
dipu
মে ৯, ২০২০ ১:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

“ভারতীয় উপমহাদেশের  হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যন্ত এক অধ্যায়,
বাবরি মসজিদ সম্পর্কে জানবো!”

ভারতের উত্তর প্রদেশের ফাইজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরে বাবরি মসজিদের অবস্থান। মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে ১৫২৮ সনে সেনাপতি মীর বাকি এই মসজিদ নির্মাণ করেন। হিন্দুদের বিশ্বাস মতে বাবরি মসজিদ যে জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে, সে জায়গাটি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের অবতার রামচন্দ্রের জন্মস্থান, এবং হিন্দুদের দাবি অতিতের রাম মন্দির ভেঙ্গে সেস্থলে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে ১৮ শতক থেকে হিন্দু-মুসলিম উভয়
সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক চলে আসছে। ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর হিন্দু মৌলবাদিরা এই মসজিদের উপর  আক্রমন চালিয়ে  সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে সমগ্র ভারত জুড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়।  দুই হাজারেরও অধিক লোক মারা যায় সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। যাদের বেশির ভাগই ছিলো  মুসলিম বাবরি মসজিদের হামলা ও ধ্বংসের পেছনে জড়িয়ে। আছে কয়েকশো বছরের সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ ও একাধিক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ঘৃন্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

১৮৫৩ সালে প্রথমবারের মতো বাবরি মসজিদ কে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন মসজিদের আঙিনায় বেষ্টনী তৈরি করে হিন্দু ও মুসলিমদের উপাসনালয় আলাদা করে দেয়। সেসময় মুসলিমদের জন্য ভিতরাংশ এবং  হিন্দুদের জন্য বহিরাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব  কিছুটা স্তিমিত ছিল। বিগত শতকের শুরুর দিকে বাবরি মসজিদের বিতর্ক নতুন করে একাধিক কলহের জন্ম দেয়।

১৯৪৯ সনে হিন্দু মৌলবাদীরা গোপনে  মসজিদের ভিতরে একটি রাম মন্দির স্থাপন করে। মুসলিমরা এর প্রতিবাদ জানায় এবং এক পর্যায়ে হিন্দু-মুসলিম উভয়ে উভয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ভারত সরকার পুরো মসজিদকেই  সিলগালা করে দেয়। তখন মসজিদ অঙ্গনে প্রবেশ অধিকার পাওয়ার জন্য হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষই আদালতের দ্বারস্থ হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রামের জন্মস্থান এবং তার সম্মানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কমিটি গঠন করে। হিন্দুদের এই পদক্ষেপে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন বিজেপি নেতা ও পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদ্ভানি।

১৯৮৬ সালে বাবরি মসজিদের দরজা হিন্দুদের জন্য খুলে দেয়ার আদেশ দেন জেলা বিচারক। মুসলিমরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন তৈরি করে।

১৯৮৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নতুন প্রচারণা শুরু করে। এবং ১৯৯০ সনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা মসজিদের আঙিনা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিতর্ক সমাধানের চেষ্টা করলেও হিন্দুত্ববাদীরা সেই চেষ্টা বৃথা করে দেয়। অবশেষে ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও ভারতীয় জনতা পার্টি এবং শিবসেনা সমর্থকরা বাবরি মসজিদের উপর  আক্রমণ চালিয়ে পুরো মসজিদটি ভেঙে ফেলে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সেই ঘৃন্য ঘটনাকে উন্মুক্ত জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখানো হলেও এর পিছনে ছিল হিন্দু উগ্রবাদীদের দীর্ঘদিনের নীল নকশা।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিজেপি ও শিবসেনা’র প্রায় দেড়লাখ করসেবক একটি শোভাযাত্রা বের করে। সে শোভাযাত্রা বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে এসে শেষ হয়। সেদিন দুপুর ১২:০০ পর্যন্ত সেই সমাবেশ চলার পর কয়েকজন করসেবক বাবরি মসজিদের গম্বুজের উপর উঠে যায় এবং পরে সহিংস হিন্দু জঙ্গিরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই মসজিদটি কে ধ্বংস করে দেয়। এত বড় একটি স্থাপনা সাধারণ বিক্ষুব্ধ জনতার পক্ষে ধ্বংস করা কোনমতেই সম্ভব নয়! পরবর্তীকালে অনুসন্ধানে দেখা যায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির বেশ ক’জন নেতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির নীলনকশার নেপথ্যে রয়েছে! বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী কয়েক মাসেই অযোধ্যা সহ সমগ্র ভারত জুড়ে বহু মুসলিমদের হত্যা করে তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রায় ২ হাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া আরো প্রায় হাজার খানেক লোক নিহত হয় এছাড়া এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছিল। লালকৃষ্ণ আদভানি মুরলী মনোহর যোশী এবং ওমা ভারতী সহ এই ঘটনায় জড়িত অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা মুসলিমবিরোধী মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোটার কে বিজেপির ভোট ব্যাংকে পরিণত করে! এর সুফল তারা হাতেনাতে পায় পরবর্তী নির্বাচনে লোকসভায় অধিক সংখ্যক আসন, ও উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা’র মাধ্যমে।

২০০৯ সালে লিবারহান কমিশন প্রতিবেদনে উঠে আসে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সাথে জড়িত ৬৮ জনের অধিকাংশই ছিল বিজেপি নেতা! তাছাড়া প্রতিবেদনটিতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যান সিংয়ের সমালোচনা করা হয়। কারণঃ- অযোধ্যার পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো উপরের নির্দেশনা ছাড়া পুলিশের এত বড় অবহেলা কিছুতেই সম্ভব নয়।

২০০৫ সালে ভারতের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান মলয় কৃষ্ণ মনে করেন যে বিজেপি, ভি এইচ পি, আরএসএস নেতারা ঘটনাটি ঘটার ১০ মাস পূর্বে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা করেছিলেন! বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়ে ভারতে বেশকিছু দাঙ্গা ও হামলার ঘটনা ঘটে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে বোম্বে দাঙ্গা সম্পন্ন হওয়ার পেছনে শিবসেনা’র ভূমিকা ছিলো গুরত্বপূর্ন! সেই দাঙ্গায় প্রায় ৯’শ জন নিহত হয় এবং প্রায় ৯ হাজার কোটি ভারতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়। এছাড়া ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মত সন্ত্রাসী সংগঠন বাবরি মসজিদ ধ্বংস তাদের সন্ত্রাসী হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতীয় আইনানুযায়ী হিন্দু দেবতা আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে এবং হিন্দু দেবতার  বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো যায়। অযোদ্বার  ভগবান রামকে শিশুরুপ মানা হয়। রামের এই শিশুরুপ আইনানুযায়ী নাবালগ আর তাই অযোধ্যার মামলায় রামের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা “ত্রিলোকিনাথ পান্ডে” এছাড়া হিন্দুদের এই মামলায় আরেকটি অংশ হলো “নির্মোহী আখাড়া” নামের একটি গোষ্ঠী এবং এদের বিপক্ষে মুসলিমদের হয়ে মামলা লড়েছে সুন্নি ওয়াকফ্ বোর্ড। ২০০২ সালের পর থেকে বাবরি মসজিদ সম্পর্কিত মামলায় নানা রকম জটিলতা দেখা যায়। আদালতের নির্দেশে জরিপ চালিয়ে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ জানিয়েছিল এই মসজিদের তলায় প্রাচীন একটি কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে, কিন্তু সেই প্রাচীন কাঠামো কোন মন্দিরে অংশ কিনা এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট নিজেও মেনে নিয়েছে যে পূর্বের কোন মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়।

২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেন বাবরি মসজিদ এলাকাটির  নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে দেয়া উচিত। কোর্টের রায় অনুযায়ী তিন ভাগের এক ভাগ মুসলমানদের এক ভাগ হিন্দুদের এবং একভাগ “নির্মোহি আখাড়া”গোষ্ঠিকে দেয়া হয়। সে রায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু মসলিম উভয়ে আপিল করায় সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট এর পূর্ববর্তি রায় বাতিল করে। অবশেষে ২০১৯ সালের ৯ই নভেম্বরে বিতর্কিত পুরো জায়গাটি জুড়ে মন্দির নির্মাণ করার পক্ষেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য সুন্নি ওয়াকফ্ বোর্ড কে অযোধ্যায় বিকল্প জমি বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়। সুপ্রিম কোর্ট একটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সেই আদালত রায় দিলে তা মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

কিন্তু অতিতে মসজিদ ভাঙ্গা কে আদালত গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার পরও, কিসের ভিত্তিতে সেই অপরাধীদের পক্ষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো বিষয়টি অনেকেরই বোধগম্য নয়!..

Facebook Comments