ঢাকারবিবার , ২৬ এপ্রিল ২০২০
  1. ইসলাম
  2. ছোট গল্প
  3. বই
  4. বিজ্ঞান-ও-প্রযুক্তি
  5. বিনোদন
  6. বিশ্বকোষ
  7. ব্যবসা
  8. ভিডিও
  9. ভ্রমণ
  10. মার্কেটিং
  11. মোটিভেশনাল স্পিচ
  12. স্বাস্থ্য বিষয়ক
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাভাতে | ছোট গল্প

প্রতিবেদক
dipu
এপ্রিল ২৬, ২০২০ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইয়াকুব হুসাইন সোহান : 
একমাত্র মেয়ে কুলসুম চৌকির উপর হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। মা জরিনা ওর দিকে কতক্ষণ উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। সে দৃষ্টিতে অশ্রু আছে কীনা বস্তির এ ছোট ঘরটিতে বিকেলের ম্রিয়মান রোদের অল্প আলোতে বোঝা গেল না। কুলসুম ঘুমিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। কিন্তু ঘুমটা যে গভীর তা ওর হাত পা ছড়ানো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাছাড়া জরিনা জানে, ক্ষুধা পেটে ঘুমাতে না চাইলেও চোখ বুজে আসে। জরিনা নিঃশব্দে ওর মাথার কাছে গিয়ে চৌকির নিচ থেকে লাল রঙের ট্রাংকটি টেনে বের করল। কোমরে রাখা চাবি দিয়ে ট্রাংকটি খুলে আরেক দফা তাকিয়ে রইল কুলসুমের দিকে। তারপর কাপড়ের সাথে সাজিয়ে রাখা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের ব্যাংকটি বের করে রেখে ট্রাংকটি আবার যথাস্থানে রেখে দিল। কুলসুম জেগে থাকলে এতক্ষণে দুনিয়া এক করে চিৎকার জুড়ে দিত। স্কুলের টিফিনের জন্য জরিনা ওকে পাঁচ-দশ টাকা যা দিত সেখান থেকে জমিয়ে রাখা এ ব্যাংকটি নিয়ে ওর সে কী উচ্ছাস! একেকদিন স্কুল থেকে এসে একেকটা জিনিস কেনার কথা বলত। আজ ওর অজান্তেই টাকাগুলো নিতে যতটুকু অপরাধবোধ কাজ করছিল জরিনার, তা আবার ভাত চেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়া মেয়েটির মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে পারবে এ চিন্তায় নিমিষেই মিলিয়ে গেল।টাকাগুলো আচলে গিট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে জরিনা। বস্তির গলিটার মুখে একটা জটলা দেখে হাঁটার গতি একটু বাড়িয়ে কাছে গিয়ে আবার হতাশ হয় সে। যে ছেলেগুলো কিছু খিচুরীর প্যাকেট নিয়ে এসেছিল তা ইতোমধ্যেই বণ্টন করা হয়ে গেছে। এখন তারা শুধু বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তোলায় ব্যস্ত। গতকাল এখানে এসেই সে এক প্যাকেট খাবার অনেক কষ্টে পেয়েছিল। মা-মেয়ে সেটুকু খাবার খেয়ে কাল সন্ধ্যা থেকে এখনো কিছু খেতে পায়নি। জরিনা যে পোশাক কারখানায় কাজ করে সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আগেই। অর্ধেক মাসের বেতন দিয়ে বলা হয়েছিল করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কারখানা খুলবে আবার। সে টাকার কিছুটা বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা মায়ের জন্য পাঠিয়ে বাকি টাকা দিয়ে এ কয়দিন কোনমতে সংসার চালিয়েছে।জরিনার স্বামী বকুল মিয়া যখন সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মারা যায় তখন কুলসুমের বয়স ছিল মাত্র এক বছর। মেয়েটাকে নিয়ে একা একা চাকরি করে এতদিন ভালই যাচ্ছিল ওদের। কুলসুম বস্তির একটা ফ্রি স্কুলে পড়ে। মায়ের কষ্টটা ও এখনই বুঝতে পারে। স্কুল শেষ করে ছোট্ট ঘরটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখার পাশাপাশি প্রায়ই রান্নাটাও করার চেষ্টা করে। এত অল্প বয়সে জরিনার স্বামী ছাড়া থাকাটা অনেকে ভাল দৃষ্টিতে দেখে না। বিয়ে করার কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছে। প্রতিবেশীদের সাথে এ নিয়ে ঝগড়াও হয় মাঝেমধ্যে। ও বুঝতে পারে না ও একা থাকলে কার কী সমস্যা! বিয়ে যে ও করতে চায়নি তা নয়, ওর আশা ছিল মেয়েটা একটু বড় হলে মনের মত কাউকে পেলে বিয়ে করে ফেলবে। গত বছর ওদের পাশের গ্রামের শাকিলের সাথে হঠাৎ দেখা হয় রাস্তায়। জরিনার বর্তমান অবস্থা জানার পর দুঃখ পেয়ে প্রায়ই মেয়েটার জন্য এটা সেটা নিয়ে আসত। শাকিল বলেছিল সে এখনো বিয়ে শাদী করেনি। ঢাকায় একটা মেসে থাকে আর রিক্শা চালায়। জরিনার মনে শাকিলের জন্য একটা টান তৈরি হয়েছিল। মনে ভেবে রেখেছিল শাকিল যদি ওর মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে ওকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে ও রাজি হয়ে যাবে। জরিনার মোবাইল ফোনে প্রতিদিনই আসত শাকিলের কল। কখনো কখনো রিক্সা এক্সিডেন্ট করেছে; জ¦রের কারনে রিক্সা নিয়ে বেরুতে পারেনি শুনলে জরিনা বিকাশের দোকানে গিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিত। একদিন রাতে হঠাৎ শাকিলের নম্বর থেকে ফোন পেয়ে রিসিভ করার সাথে সাথে এক দলা থুথুর মতো নারীকণ্ঠে একনাগাড়ে গালি শুনে ওর আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না।  এক সন্তানের জনক শাকিল ওর সাথে এতদিন শুধু অভিনয় করেছে। এরপর থেকে বিয়ের কথা শুনলে মনের অজান্তেই ওর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।

জনাকীর্ণ গলি থেকে বের হয়ে শুনশান নিরবতার বড় রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়েই সরকারি খাদ্য বিক্রি করা ট্রাকের সামনে বুভুক্ষু মানুষের বিশাল লাইন। জরিনা লাইনের শেষ প্রান্তে এসে দাড়ায়। সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমাকাশে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। লাইনের লোকসংখ্যা দেখে খাদ্য না পাওয়ার অজানা আশংকা কিছুটা বাস্তব মনে হল জরিনার কাছে। লাইনের সামনের দিকে কিছুক্ষণ পরপর বাকবিতণ্ডার আওয়াজ ক্রমশ বাড়তে লাগল। কানাঘুসা শোনা গেল আজকের মত তারা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। লাইনে দাড়ানো শ দুয়েক ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ বাড়তে লাগল। একসময় সবাই মিলে হামলে পড়ল খাদ্যবাহী ট্রাকের ওপর। সবার সাথে জরিনাও দৌড়ে সামনে চলে আসল। পুরুষেরা কয়েকজন তাদের শক্তির জোরে ট্রাকের উপরে উঠে পড়েছে। অন্যরাও চেষ্টা করছে ওঠার। ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল জরিনা। ক্ষুধার্ত শরীরটাকে টেনে তোলার অগেই কয়েকজোড়া পা তাকে পিষ্ঠ করে দিয়ে গেল। জরিনা আর উঠতে পারবে কিনা জানেনা। ধীরে ধীরে ওর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যেতে লাগল। আর কিছু ভাবতে পাছে না সে। শুধু জোর করে খুলে রাখতে যাওয়া আলো আধারীর চোখ দুটিতে তখন ভাসছে কুলসুমের ঘুমন্ত মুখ।

Facebook Comments