অনন্য রাঙ্গামাটি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য-চট্টগ্রাম।  চট্টগ্রাম শহরেই বসবাস আমার। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের আশপাশ সহ কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন ভ্রমন হলেও, ভ্রমন হয়নি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটি। সুউচ্চ পাহাড়, বহমান নদী আর দৃষ্টিনন্দন লেকবেষ্টিত এক বৈচিত্রময় জনপদ এ রাঙ্গামাটি। বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্ব সীমান্তবর্তী সবচেয়ে বড় জেলা রাঙ্গামাটি। চারদিক জীবন্ত সবুজ। সবুজে মোড়ানো পাহাড়। চিরহরিৎ গাছের ছড়াছড়ি। সুউচ্চ পাহাড় গায়ে দাঁড়িয়ে গাছেরা যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে। সবুজের পতাকা উড়িয়ে। আমরা যেন ডুবছি সবুজের সাগরে।

আল্লাহর তা’আলার অসীম কুদরতের নিদর্শন পাহাড় ঘেরা এ জেলায় রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ। কাপ্তাই লেক। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আঁধারের রাঙ্গামাটি তার বৈচিত্রময়তার কারনে আকর্ষনীয় স্থান হিসাবে দেশী বিদেশী পর্যটকদের নজর কেড়েছে। মনে স্থান করে নিয়েছে।

এখানে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক্, পাংখোয়া, লুসাই, সুজে সাওতাল , রাখাইন সর্বোপরি বাঙ্গালীসহ ১৪টি জনগোষ্ঠির বসবাস। এসব জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রাও দেখার মত।

তাই এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে ক্লাস থেকে সিদ্ধান্ত হলো রাঙ্গামাটি শিক্ষা ছফরের। সাথে সাথেই  মানসিকভাবে প্রস্তুত হলাম। সিদ্ধান্তক্রমে আয়োজন চলতে লাগলো। ভিতরে বাহিরে। জল্পনায় কল্পনায়। তুলি-রং ছাড়াই ছবি আঁকতে লাগলাম অদেখা রাঙ্গামাটির।দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলো ঈদের দু’দিন পর। ভ্রমনের। আরামপ্রিয় আমরা ভ্রমনের সুবিধার্তে একটি হাইচ রির্জাভ করলাম। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। সাথে ভ্রমনের ক্লান্তি-অবসাদ দূর করতে আয়োজন করি ভারি-হালকা নানান ফরদের মুখরোচক খাবারের। ভ্রমণপাগল দলটির ভালো জানা, জার্নিতে পেট ঠিক তো ট্যুর ইনজয়াবল। তাই রকমারি আয়োজন। খাবারের। রীতিমতো ভোজন প্রস্তুতি।  তখনো মুয়াজ্জিন জাগেন নি, মিনরে মিনারে ফজর ঘোষিত হয় নি।কাক পক্ষীরাও শুরু করে নি কিচিরমিচিরে আল্লাহর স্তুতি-তাসবিহ। আমরাই জাগলাম। চারপাশ ঘুমন্ত। নীরব। যেনো বিদায়ি দু’আ দিচ্ছে। কল্যাণের।নির্বিঘ্ন সফরের।প্রস্তুত পুরো কাফেলা। রোমাঞ্চের শুরু সুবহে সাদেকেই।

ফজর শেষ। তাসবিহ তিলাওয়াত শেষ না হতেই গাড়ী হাজির। উপস্হিতির জানান দিচ্ছে হর্ণ বাজিয়ে। তর সয়নি কারো।অঘোষিত প্রতিযোগিতা।আগে উঠার। সুবিধে মতো সবাই বসলাম শান্তভাবে। দু’আ পড়লাম বাহন আরোহণের। গাড়ী চলতে শুরু করলো। মানযিল পানে। অল্পতেই শরীরে স্নিগ্ধতা অনুভব করলাম। আমীর সাহেব শৃংখলাসহ আরো দু-একটি কথা বললেন। অনেকেই ঝিমুতে শুরু করলো। কাফেলায় একাধিক শিল্পী থাকতে কি আর অলস হয়ে বসে থাকতে পারি? আলস্যতে সজীবতা ফেরাতে শুরু করলাম যৌথ কণ্ঠে ইসলামী সংগীতের আসর। ধর্মের দেশের গান।

ঘন্টা খানেক চলার পর রাউজান-রানীরহাট পেরুতেই দেখা হলো পাহাড়িয়া আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু পথের। উঁচু-নিচু মানে সাধারন উঁচু-নিচু নয়। উঁচুতে যখন বাহনটি চলতে শুরু করে, তখন বুক দুরুদুরু কাঁপে। চুপসে যায় আত্মার কোলাহল। তেমনি হয় যখন আবার নিচুতে নামে। ভয়-আনন্দ, আনন্দ-ভয়। যেনো মেঘ রোদ্দুর খেলা। বর্ষার আকাশ। বলতে গেলে ভয় আর আনন্দের মিশ্রণে এক টানটান উত্তেজনার মধ্যে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের রাঙ্গামাটি। হাসান খাঁন। আমাদের বন্ধু। শহরের রিজাব বাজারে অপেক্ষায় ছিলো আমাদের অভ্যর্থনায়। আমরা আপ্লুত হলাম। বন্ধু হাসানই আমাদের রাহবার গাইড। হাসান খাঁনের সাথে ছুটলাম ঝুলন্ত ব্রীজের দিকে। শহরের তবলছড়ি পার হতেই দেখি আবার আগের মতো পাহাড়চূড়ায় এক পথ। যা আসার পথে দেখে আসা উঁচু পথ গুলোকে হার মানিয়েছে। ভয়ে কেঁপে উঠলো সবার অন্তর। না জানি কি হয়? আল্লাহু-আকবার ধ্বনিতে মুখরিত হলো স্পটটি।

ইতোমধ্যে পৌঁছে গেলাম ঝুলন্ত সেতুর গেইটে। গাড়ী  পার্কিং করে সবাই নেমে পড়লাম। এক চুমুক পানি পান করে পায়দলে হাটা শুরু। গেইটে আসতেই দেখি টিকেট কাউন্টার। বন্ধু হাসান খাঁন টিকেট সংগ্রহ করলে অনায়াসে প্রবেশ করি সবাই।

দেখা হলো কাঙ্ক্ষিত সেই ঝুলন্ত সেতু। দুটি পাহাড়ের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে কাপ্তাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে এ সেতু। উঠেই মনে হলো এটি ঝুলন্ত নয়, নড়ন্ত সেতু। ব্রীজটি এমন ভাবে নড়ছে, মনে হয়েছে যেন দোলনা নড়ছে।

সেতু পার হয়ে সোজা চলে গেলাম পার্কে। পাহাড়ের চূড়ায়। পাহাড় ছেড়ে নামনাম লেকে। নেমেই দেখি আনারস ভর্তি দু’টি নৌকা। জানতাম আনারস চাষে রাঙ্গামাটি বিখ্যাত।  ভ্রমনকে রসাল করতে শুরু করলাম রসেভরা আনারস ভক্ষণ। নতুন খাদ্য যুক্ত হলো আমাদের সফরে। মনে পড়ে এখনো সেই রসসিক্ত আনারস। তরতাজা ফ্রেস আনারস এত্তগুলো একসাথে দেখিনি এর আগে। দামে সস্তা আর মিষ্টতায় আবিষ্ট হয়ে, যে যার মতো করে খেলাম। কেউ পাঁচটা। কেউবা চারটা। তিনটার কমে কিন্তু কেউ না। তবে আকারে ছোট। বিক্রেতা আনারসগুলো এক অভিনব পদ্ধতিতে কেটে পরিবেশন করলো। আগে কখনও দেখিনি কোথাও। শিল্প। আমার কাছে তুলির টানের চেয়ে বেশী নিখুঁত নিপুণ মনে হতে লাগলো নাম না জানা ধারালো যন্ত্রের টানকে। অসাধারণ। যেনো তার শিল্পিত হৃদয় অঙ্কিত আনারসে। চোখ জুড়ায়। হৃদয়ের তৃঞ্চা বাড়ায়।

ঝুলন্ত সেতু  ও তার আশপাশে চক্কোর শেষে গেলাম ডিসি বাংলোতে। ডিসি বাংলোর যেখানটায় সবার চোখ আটকে যায়। প্রাচীন এক বৃক্ষ। মহিরুহ। ঝুলানো বোর্ড। অবাক হলাম। বোর্ডটির তথ্য মতে বৃক্ষটির নামঃ চাপালিশ। ২০১২ সাল পর্যন্ত বৃক্ষটির বয়স ৩০৮ বৎসর। ক্লান্তির ছাপ নেই বৃক্ষের কোথাও। কত বছর দিচ্ছে ছায়া মায়া অবিরত। ক্লিষ্ট পথিক পেয়েছে সজীবতা। আমরাও তার শীতল ছায়ায় বসেছি। খেয়েছি। কোনোদিন সে প্রতিদান চায়নি। বৃক্ষটির ছায়া আর পাশ ঘেষে আছে দৃষ্টিনন্দন পার্ক। আছে শরীর চর্চার কিছু যন্ত্র। সেখানে কসরত করলাম কিছুটা সময়। পার্কটির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে কাপ্তাই লেক। মনকাড়া। নান্দনিক।  নেমে পড়লাম গোসলে। লেকের পানি খুব সচ্ছ। কাচের মতো। আর মাটিগুলো এতোটায় কোমল আর সুন্দর, সাবানের মতো ব্যবহার করা যায়। অপরিমেয় অসহ্য আনন্দ উপভোগ করলাম সেখানে। যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। বর্ণনাতীত। গোসলান্তে জোহরের নামাজ শেষে চাপালিশ তলায় জমালাম ভোজনসভা। সারলাম আহার কর্ম। তৃপ্তি ভরে  সবাই। কোনো অভিযোগ অনুযোগ ছাড়াই।

রাঙ্গামাটির আরেকটি দর্শনীয় স্থান রাজবন বিহার। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। তাদের ধর্মীয় কিছু নিদর্শন রয়েছে সেখানে। পার্বত্য বৌদ্ধধর্মীয় গুরু বনভন্তে। এ বিহারে তাঁর অবস্থান। অপারাহ্নে বৌদ্ধ বিহার দর্শনে গেলাম। প্রবেশ কালেই ভিক্ষু ও বান্তেদের (ধর্মীয় নেতা) সাথে দেখা হলো। কথা হলো ধর্মীয় বিষয়ে। কৌতুহল নিবৃত করতে চাইলাম। গোমট বিষয়ের জট খুলতে চাইলাম। সুনির্দিষ্ট কিছু পাইনি। বাড়াতে পারিনি জানার পরিধি তাদের আলাপচারিতায়। কেমন নিরস নিরাসক্ত মনে হলো তাদের। কোথাও চরম ঘাটতি। যা পুরণ হবার নয়। চোখে মুখে রাজ্যের হতাশা। চলনে বলনে নেই কোনো দশা। মুসলিম হওয়ার গর্বে নিজেদের ধন্য মনে হলো। এরপর ঘুরে ফিরে পুরো বিহার দেখলাম। বিহারের ভবন গুলোর অপরূপ কারুকার্য দেখে অবাক হলাম। দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হয়েছে পুরো বিহার এলাকাকে। বের হয়ে কিছুদূর এসে আছরের নামাজ পড়লাম।

নামাজ শেষে সেনাবাহিনীর পার্কে গেলাম। সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে উপ-জাতীয় জাদুঘরে গেলাম উপজাতীয় যাদুঘরে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীদের কৃষ্টি,সংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন। উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিষ্টিটিউটে এ যাদুঘর নির্মিত হয়েছে। জানতে পারলামঃ প্রতিবছর এপ্রিলে উপজাতীয়দের “বিজু উৎসব বা চৈত্র সংক্রান্তী উৎসব” হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও জাঁকজমকভাবে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয়দের প্রধান সামাজিক উৎসব। এরই মধ্যে একটি রহস্য উন্মোচিত হলো। তাহলো রাঙ্গামাটি শহরজুড়ে মোড়ে-মোড়ে বিশাল আকৃতির আয়না বসানো। কৌতুহল দমাতে না পেরে পড়ন্ত বিকেলে প্রশ্ন করলাম বন্ধু হাসানকে। উত্তরে সে যা বলল, এটি পার্বত্য শহর হওয়ার কারনে, গাড়ি কন্টোল করে চালানোর জন্য এই ব্যবস্থা।

ও হ্যাঁ!!! এসবের মাঝে একটি উপ-জাতীয় মার্কেটে গেলাম। পণ্য কিনি আর না কিনি, শুরু করলাম উপ-জাতীয় ভাষায় দু-একটি কথা বলা। বললাম, ‘ম-নিকম বালা’ ও ‘শওন্ড মিন্না ছে সাই’। সেখানেও অনেক ভালো লাগলো।

দিনশেষে সূর্যি মামার বিদায় বেলায় আমরাও রাঙ্গামাটিকে বিদায় জানালাম। অরুণাস্তাচলের দৃশ্যটি কখনো ভুলবার নয়।

সারাদিনের  ক্লান্তি-শ্রান্তি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। গাড়ী চলতে শুরু করলো। অল্প পরেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। রাউজান পেছনে ফেলে ঘুম ভাঙ্গলো। চাঙ্গা চাঙ্গা লাগলো শরীর মন। বাকি সময়টাতে শুনলাম শুনালাম নিজেদের অভিব্যক্তি। এরই মধ্যে ফিরে এলাম আপনভূমে।জামেয়া ক্যাম্পাসে। প্রায় ন’টা তখন ঘড়ির কাটায়।

কেন যাবেন রাঙামাটি ——

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। এ পাহাড়ী অঞ্চলে আপনার জন্য রয়েছে মনোলোভা আকর্ষণীয় উপাদান। রাঙ্গামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত ব্রীজ, বেসরকারী পর্যটন কেন্দ্র পেদা টিং টিং, চাকমা রাজবাড়ী, রাজ বন বিহার, উপজাতীয় যাদুঘর, সুবলং এর প্রাকৃতিক ঝর্ণা, নানিয়ার চরের বুড়িঘাটে বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়ক মুন্সি আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধ সহ রাঙ্গামাটির প্রাকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য। তাই আপনিও ভ্রমন করতে পারেন অনন্য এ রাঙ্গামাটিতে।

3 thoughts on “অনন্য রাঙ্গামাটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *